Writing

কদরের রাত কবে

লাইলাতুল কদর কি প্রতি বছর একই দিনে হয়?
কদরের রাতটি কি স্থানান্তরিত হতে পারে?
কদরের রাতটি স্পষ্ট না থাকার কারণ কী?
লাইলাতুল কদর আসলে কোন রাত, এ বিষয়ে শীর্ষ মুহাদ্দিস ইমামগণ হাদিসের আলোকে বিভিন্ন মতামত প্রদান করেছেন।

প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ ইমাম ইবনু হাজার আসকালানি (রাহ.) তাঁর জগদ্বিখ্যাত সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারি’-তে লাইলাতুল কদরের তারিখ নিয়ে আলিমগণের অনেকগুলো মতামত উল্লেখ করেছেন। যেসব রাত কদরের হতে পারে:

২১তম রাত

ইমাম তিরমিযি তাঁর সুনানে লিখেছেন, ইমাম শাফিঈ ২১তম রাতকে কদরের রাত মনে করতেন। তাঁর মতের পক্ষে দলিল হলো আবু সা‘ঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস।
[ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ২৬৬১]

মুহাদ্দিসগণের অনেকেই এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, সে বছর কদর হয়েছিলো ২১তম রাতে। (মুফতি আমিমুল ইহসান (রাহ.) সংকলিত, ড. আব্দুল্লাহ্ জাহাঙ্গীর (রাহ.) অনূদিত ফিকহুস সুনান গ্রন্থে (১/৪৮০) এই বিষয়টি টীকায় উল্লেখিত হয়েছে)

শেষ ৭ রাতের কোনো একটিতে

আরেকদল আলিমের মতে, এটি শেষ ৭ রাতের কোনো এক রাতে। তাঁদের পক্ষে দলিল হলো ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
‘‘তোমরা রামাদানের শেষ দশকে কদরের রাত অনুসন্ধান করো। তোমাদের কেউ যদি দুর্বল অথবা অক্ষম হয়ে পড়ে, তবে সে যেন শেষ ৭ রাতে অলসতা না করে।’’
[ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ২৬৫৫]

২৩তম রাত

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস (রা.) রামাদানের ২৩তম রাতকে কদরের রাত মনে করতেন।
[ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ২৬৬৫]

২৪তম রাত

২৪তম রাত (জোড় রাতেও হতে পারে)।
তাবিঈ ইকরামা (রাহ.) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত যে,
‘তোমরা ২৪তম রাতে (কদর) তালাশ করো।’
[ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ২০২২]

জোড় রাতে কদর হওয়ার বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। দেখে নিতে পারেন।

২৭তম রাত

আলিমগণের বিরাট এক জামাত বলেছেন, এটি রামাদানের ২৭তম রাতে। এই মত দিয়েছেন উবাই ইবনু কাব (রা.), ইবনু আব্বাস (রা.), উমার (রা.), ইমাম আবু হানিফা (রাহ.)-সহ অনেকেই। এই মতের পক্ষে দলিল হলো, সাহাবি উবাই ইবনু কা’ব (রা.) কসম খেয়ে বলেছেন, ২৭তম রাতটি কদরের রাত।
[ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ২৬৬৮]

শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলো

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘‘তোমরা রামাদানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে কদরের রাত তালাশ করো।’’
[ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ২০১৭]

রামাদানের শেষ ১০ রাতে

অধিকাংশ আলিমের মতে, এটি রমাদানের শেষ দশকে রয়েছে। তাঁরা জোড়-বিজোড় নিয়ে এত কথা বলেননি। তাঁদের পক্ষে দলিল হলো: রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘‘তোমরা রামাদানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করো।’’
[ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ২০২০]

হাদিসগুলোর মাঝে সমন্বয় ও সমাধান

বিখ্যাত ইমামদের অনেকেই হাদিসের এসব বিভিন্নতার কারণে সবগুলো হাদিসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বলেছেন, শেষ ১০ রাতের যেকোনো রাতে কদর হয়, তবে তা প্রতি বছর নির্দিষ্ট একটি দিনে হয় না, বরং এটি বিভিন্ন বছরে ভিন্ন ভিন্ন দিনে হয়। ইমাম মালিক, আহমাদ, ইসহাক, সুফিয়ান সাওরি, ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইমাম নববি, ইমাম ইবনু আবদিল বার, ইবনু হাজার, ইবনু উসাইমিন (রাহিমাহুমুল্লাহ) এই মত দিয়েছেন। তাঁরা সবাই ছিলেন তাঁদের নিজ নিজ সময়ের শ্রেষ্ঠ ইমাম ও মুহাদ্দিস। শুধু তাঁরাই নন, আলিমগণের বিরাট এক জামাত এই মতটি সমর্থন করেছেন। এই মতটি মেনে নিলে হাদিসগুলোর মাঝে কোনো বিরোধ বা পরস্পরবিরোধিতা থাকে না।

সাহাবিগণের ছাত্র তাবি‘ঈ আবু কিলাবাহ (রাহ.) বলেন, ‘লাইলাতুল কদর শেষ দশকের মাঝে স্থানান্তরিত হয়।’ [ইমাম তিরমিযি তাঁর সুনান গ্রন্থের ৭৯২ নং হাদিসের আলোচনায় সনদসহ এটি এনেছেন]

বিভিন্ন হাদিস থেকে বোঝা যায়, রামাদানের ২১, ২৩ ও ২৭তম রাত অধিক সম্ভাবনাময়। তাই, এই রাতগুলোতে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। যদিও শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই কদর হতে পারে। এমনকি জোড় রাতগুলোও কিছুটা সম্ভাবনাময়।

মুহাদ্দিসগণ বলেন, কদরের রাতটি গোপন রাখার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন শেষ দশকের প্রতিটি রাতকেই কদরের রাত মনে করে ইবাদত করে। হাদিসেও এমনটি এসেছে যে, নবিজিকে কদরের রাতটি জানানো হয়েছিলো, কিন্তু তাঁর অন্তর থেকে সেটি উঠিয়ে নেওয়া হয়, ফলে তিনি আর মনে রাখতে পারেননি। তখন তিনি বলেন,
‘‘হয়তো এর মধ্যেই তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে।’’
[ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ২০২৩]

লিখেছেন

Picture of নুসুস টিম

নুসুস টিম

কুরআন ও হাদিসের মূল পাঠকে নুসুস (text) বলা হয়। নুসুসের উপর ভিত্তি করেই আমরা লেখালেখি করি।

লেখকের অন্যান্য সকল পোষ্ট পেতে ঘুরে আসুন
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Islami Lecture